কবিতা - এপ্রিল ফুল' উদযাপনের বিচিত্র কাহিনী, লেখক - মজিবুর রহমান, প্রধানশিক্ষক, কাবিলপুর হাইস্কুল
'এপ্রিল ফুল' উদযাপনের বিচিত্র কাহিনী
মজিবুর রহমান, প্রধানশিক্ষক, কাবিলপুর হাইস্কুল
পয়লা এপ্রিল পালন করা হয় 'এপ্রিল ফুল'। এদিন বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীরা একে অপরকে বোকা বানানোর চেষ্টা করে এবং এর মাধ্যমে একটা আনন্দ, মজা ও হাস্যরস তৈরি হয়। যাকে বোকা বানানো হয় তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলা হয় 'এপ্রিল ফুল'। বোকা বানানোর প্রক্রিয়ায় হালকা মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয়ও নেওয়া হয়। কিন্তু উদ্দেশ্য থাকে একটাই- নির্ভেজাল-নিষ্পাপ কৌতুক-রসিকতা সৃষ্টি। পশ্চিমা দেশগুলোতে সংবাদমাধ্যম ফলাও করে ভুয়া ও ভুল সংবাদ ছাপায়। পরদিন সংশোধনী দিয়ে জানিয়ে দেয়, খবরটা আসলে 'এপ্রিল ফুল' ছিল। এখন সমগ্ৰ বিশ্বেই সামাজিক মাধ্যমের 'ওয়াল', 'পেজ' এপ্রিল ফুলের 'প্র্যাঙ্ক', 'উইট'-এ ভরে ওঠে। ইন্টারনেটের আবির্ভাব এপ্রিল ফুলের আনন্দকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বোকা বানাতে বুদ্ধির প্রশংসনীয় প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। মজার পরিবেশ সৃষ্টিতে মস্তিষ্কের ব্যবহার বাড়ছে।
পয়লা এপ্রিল সাধারণত কোনো ছুটির দিন না হলেও এপ্রিল ফুল নানান দেশে নানা ভাবে পালিত হয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। পরিবার থেকে প্রতিষ্ঠানের পরিচিতজনেরা পরস্পরের সঙ্গে এই দিনের আনন্দ উপভোগ করে। এপ্রিল মাসের প্রথম দিনটিকে বোকা বানানোর দিন হিসেবে বহুদিন ধরে পালন করা হলেও এর উৎস নিয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু জানা যায় না। তবে এপ্রিল ফুলের সূচনা সম্পর্কে বেশ কয়েকটি তত্ত্ব, ধারণা বা মিথ চালু রয়েছে।
ক্যালেন্ডারের সাথে সংযোগ : রোমান সম্রাট রোমুলাস ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ১০ মাসবিশিষ্ট একটি ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন। পরে আরও দুটি মাস সংযুক্ত করা হয়। রোমুলাস প্রবর্তিত ক্যালেন্ডারে সাধারণভাবে দিন সংখ্যা ছিল ৩৫৫। শাসকের ইচ্ছানুসারে কখনও কখনও অতিরিক্ত ২২-২৩ দিন যুক্ত করে ৩৭৭-৩৭৮ দিনের বছর তৈরি করা হত। ক্যালেন্ডার পরিবর্তনশীল হওয়ার ফলে শাসকশ্রেণী বাড়তি সুবিধা ভোগ করত। সাধারণ মানুষ গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্মের দিনক্ষণ নির্ধারণ করতে সমস্যার সম্মুখীন হত। সম্রাট জুলিয়াস সিজার (১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নতুন ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন যা তাঁর নামানুসারে 'জুলিয়ান ক্যালেন্ডার' নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বছর শুরু হত এপ্রিল মাস থেকে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে দুই ধরনের বছর থাকে। একটি সাধারণ বছর- ৩৬৫ দিন এবং প্রতি চতুর্থ বৎসরে একটি অধিবর্ষ- ৩৬৬ দিন। এই ক্যালেন্ডার প্রতি ৪০০ বছরে ৩.১ দিন বৃদ্ধি পায়। পোপ ত্রয়োদশ গ্ৰেগরি জর্জিয়ান (১৫০২-১৫৮৫) ১৫৮২ সালে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের বদলে নতুন ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন যা তাঁর নামানুসারে গ্ৰেগরিয়ান অথবা জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার রূপে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বছর শুরু হয় পয়লা জানুয়ারি। সাধারণ বছর ও অধিবর্ষের নিয়ম নতুন ও পূর্বতন ক্যালেন্ডারে এক হলেও নতুন ক্যালেন্ডার ৪০০ বছরে মাত্র ০.১ দিন বৃদ্ধি পায়। জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের বদলে গ্ৰেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করার সময়েই দুই ক্যালেন্ডারের মধ্যে ১৩ দিনের ব্যবধান সৃষ্টি করা হয়। উদাহরণ স্বরূপ, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের তারিখ জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৫শে অক্টোবর কিন্তু গ্ৰেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৭ই নভেম্বর ধরা হয়। একইভাবে গ্ৰেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০২৫ সালের পয়লা এপ্রিল দিনটি জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে হবে ১৯শে মার্চ। ফ্রান্স প্রথম জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারকে স্বীকৃতি দেয়। জুলিয়ানের বদলে জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হলেও অনেকেই এই পরিবর্তন মেনে নিতে চায়নি। অনিচ্ছুকরা আগের মতোই পয়লা এপ্রিল নতুন বছর উদযাপন করতে থাকে। ব্যাপারটি বিতর্ক সৃষ্টির থেকেও বেশি হাসির খোরাক হয়ে দাঁড়ায়। এরই মাঝে প্রচার শুরু হয় যে, যারা গ্ৰেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করছে তারা জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের অনুসরণকারীদের মজার পাত্র করে তুলবে এবং 'এপ্রিল ফুল' বলে ডাকবে। 'এপ্রিল ফিশ' থেকে 'এপ্রিল ফুল' কথাটা এসেছে। আসলে ফ্রান্সে পয়লা এপ্রিল 'পয়সন দ্য এভ্রিল' পালিত হয় এবং এর সঙ্গে মাছের একটা সম্পর্ক আছে। এপ্রিলের শুরুর দিকে ডিম ফুটে মাছের বাচ্চা বের হয়। এই শিশু মাছগুলোকে সহজে বোকা বানিয়ে ধরা যায়। পয়লা এপ্রিল যাকে বোকা বানানো হয় তার পেছনে একটা কাগজের মাছ এমনভাবে লাগিয়ে দেওয়া হয় যাতে সে বুঝতে না পারে। 'পয়সন দ্য এভ্রিল' চিৎকার শুনে সে জানতে পারে যে তাকে বোকা বানানো হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আজও বেশিরভাগ অর্থোডক্স গির্জা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে ইস্টার উদযাপন করে। গ্ৰেট ব্রিটেন গ্ৰেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্ৰহণ করে ১৭৫২ সালে আর রাশিয়া গ্ৰহণ করে ১৯১৮ সালে।
রোমান তত্ত্ব : রোমান দেবতা প্লুটো বিয়ে করার জন্য পারসিফনকে অপহরণ করেন এবং ভূগর্ভে লুকিয়ে রাখেন। সেরিস 'বোকার মতো' মেয়েকে মাটির ওপরে খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। সেই কাহিনীর অবলম্বনেই রোমানরা নাকি পয়লা এপ্রিল 'বোকা দিবস' উদযাপন করেন।
ব্রিটিশ কাহিনী : মনে করা হয় যে, প্রাচীনকালে নটিংহ্যামশায়ারের গথাম শহরে মোটা বুদ্ধির মানুষেরা বসবাস করত। গথামবাসীরা তাদের শহরে একজন দিগ্বিজয়ী রাজাকে ঢুকতে বাধা দেয়। ক্ষুব্ধ রাজা ওই শহরে সেনাবাহিনী পাঠান। সেনারা দেখল শহরের সবাই বোকার মতো আচরণ করছে। সেনাবাহিনীর কথা শুনে রাজা পয়লা এপ্রিল ঘোষণা করেন, এমন বোকাদের বিরক্ত করার দরকার নেই। সেই থেকে দিনটি 'বোকা দিবস'।
জার্মান লোককথা : ১৫৩০ সালের ১ এপ্রিল জার্মানির অগসবার্ঘ শহরে একটি আলোচনাসভা বসার কথা ছিল। আলোচনাসভার সম্ভাব্য ফলাফলের উপর অনেকেই অনেক টাকা বাজি ধরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই আলোচনাসভা বসেই না। এতে বহু মানুষের বিপুল পরিমাণ টাকা গচ্চা যায়। বাজি ধরা মানুষদের বোকামি থেকে এপ্রিল ফুলের শুরু।
নেদারল্যান্ডসের কাহিনী : ১৫৭২ সালের ১ এপ্রিল নেদারল্যান্ডসের ডেন ব্রিয়েল শহরটি স্প্যানিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়। এদিন বিদ্রোহীরা স্পেনের শাসকদের বোকা বানিয়ে ছাড়ে। তারপর থেকেই নাকি এপ্রিল ফুল পালন করা হয়।
চসারের গল্প : ইংরেজি কবিতার জনক জিওফ্রে চসারের (১৩৪৩-১৪০০) বিখ্যাত 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস'-এর অন্তর্ভুক্ত একটি গল্পে রাজা দ্বিতীয় রিচার্ড ও রানি অ্যানির এনগেজমেন্টের তারিখ উল্লেখ করা হয় ৩২ মার্চ। জনসাধারণ এই অবাস্তব দিনকেই সত্যি বলে মনে মেনে নেয়। তখন থেকেই নাকি ৩২ মার্চ অর্থাৎ ১ এপ্রিল বোকা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়।
এপ্রিল ফুলের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক : অনেকেই মনে করেন রাজা ফার্দিনান্দ (১৪৫২-১৫১৬) ও রানি ইসাবেলা (১৪৫১-১৫০৪) স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটান। তাঁরা স্পেনের মুসলিম অধ্যুষিত গ্ৰানাডায় হামলা করেন এবং পরাজিত প্রচুর সংখ্যক মুসলিম নরনারীকে মসজিদে আটকে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারেন। দিনটি ছিল পহেলা এপ্রিল। কিন্তু এই কাহিনীটি মূল ধারার ইতিহাসবিদদের দ্বারা সমর্থিত হতে দেখা যায় না। তাঁরা বলেন, ফার্দিনান্দ-ইসাবেলা গ্ৰানাডা দখল করেন জানুয়ারি মাসে। গ্ৰানাডার মুসলিম শাসক দ্বাদশ মোহাম্মদের সাথে আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমেই তা হস্তান্তর করা হয়। এপ্রিল ফুলের কোনো ট্র্যাজেডি ঘটেনি। কাজেই এপ্রিল ফুল নিয়ে মুসলমানদের মন খারাপ করার বিশেষ কোনো কারণ নেই।
প্রাণখোলা হাসি মজা মস্করা ঠাট্টা তামাশা কৌতুক রঙ্গ রসিকতা মানুষের ব্যস্ত জীবনে দিন দিন কমে যাচ্ছে। অথচ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য এগুলোর উপযোগিতা অস্বীকার করা যায় না। তাই আমরা উৎসবের সমারোহে সবাই সামিল হতে চেষ্টা করি। এপ্রিল ফুল তেমনই একটি আনন্দ করার দিন। এদিন 'বোকা' বনেও কারোর 'প্রেস্টিজ' নষ্ট হয় না কারণ যারা বোকা বানায় তারা সবাই ভালোবাসার মানুষ।
এপ্রিল ফুলের উৎস আজও অজানা। এর সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। রহস্য রয়ে গেছে। রহস্যময়তার একটা বাড়তি আকর্ষণ থাকে। তাই বোকা দিবসের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টাও একধরনের বোকামি বলে মনে হয়।
No comments