গল্প - গুপ্ত দলিলের অভিশাপ, লেখক - এস এম মঈনুল হক
গুপ্ত দলিলের অভিশাপ
এস এম মঈনুল হক
বাংলার আকাশে তখন মেঘ ঘনিয়ে আসছে। সময়টা ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি। মুর্শিদাবাদ নবাব আলীবর্দী খাঁ সবে সিংহাসনে বসেছেন। শত্রু তার চারপাশে—মারাঠা ভুঁইয়া থেকে শুরু করে নিজস্ব দরবারের ষড়যন্ত্রী পর্যন্ত। মুর্শিদাবাদের রাজপ্রাসাদে এক রাতে গোপনে একটি চুক্তিপত্র লেখা হয়। সেই চুক্তিপত্রে বাংলার ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার মতো কথা লেখা ছিল—কে নবাবের উত্তরসূরি হবে, কারা রাজস্ব আদায় করবে, আর কারা ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাকে বিক্রি করবে। দলিলটির নাম ইতিহাসে কোথাও নেই, কারণ সেটি হারিয়ে যায়।
কিন্তু কথিত আছে, সেই দলিলের সঙ্গে ছিল অভিশাপ—যে-ই এটি খুঁজে বের করতে চাইবে, সে রক্ত ঝরানো ছাড়া বাঁচবে না।
চারশো বছর পরে, ২০২৩ সালের কলকাতায়, ইতিহাস গবেষঅরিন্দম সেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো গ্রন্থাগারে কাজ করছিলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় আলীবর্দী খাঁর প্রশাসনিক সংস্কার। একদিন লাইব্রেরির ধূলোমাখা কোণে তিনি খুঁজে পান একটি অদ্ভুত কাগজ—কোনো অজানা লেখকের স্মৃতিকথার খণ্ডাংশ। সেখানে লেখা ছিল— "একটি দলিল মুর্শিদাবাদের হজরতবাগানের পুরনো ইমারতে লুকিয়ে রাখা আছে। যার হাতে এটি যাবে, তার হাতে থাকবে বাংলার ভাগ্য।"
অরিন্দমের কৌতূহল বাড়তে থাকে। তিনি জানতেন, এটি যদি সত্যি হয়, তবে ইতিহাসের ধারা পাল্টে যেতে পারে। কিন্তু তিনি জানতেন না—কেউ কেউ আজও সেই দলিলের খোঁজ করছে, এবং তারা মৃত্যুর ভয়কেও পরোয়া করে না।
অরিন্দম যখন কাগজটি আবিষ্কার করেন, তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা। লাইব্রেরি ফাঁকা, শুধু একটি লণ্ঠনের আলোয় ঘর ভরা। বাইরে হালকা বৃষ্টি। কাগজটি পড়তে পড়তে তাঁর শরীর শিউরে উঠল। কাগজের প্রান্তে রক্তের মতো শুকনো দাগ। যেন কেউ মরার আগে লিখেছিল।
পরদিন সকালেই তিনি যোগাযোগ করলেন তাঁর সহকর্মী ইতিহাসবিদরুখসানাআখতার-এর সঙ্গে। রুখসানা ছিলেন মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা করা এক খ্যাতিমান তরুণী। তিনি প্রথমে হাসলেন—“অরিন্দমদা, এসব তো শোনা কথা। এভাবে সত্যি কোনো দলিল গায়েব থাকে নাকি?”
কিন্তু তাঁর চোখে ঝিলিক ছিল। তিনি জানতেন, বাংলার ইতিহাসে অনেক অজানা গোপন অধ্যায় রয়েছে।
যখন তাঁরা ঠিক করলেন মুর্শিদাবাদে যাবেন, ঠিক সেই সময় একটি কালো গাড়ি কলকাতার ব্যস্ত কলেজ স্ট্রিটের গলিতে দাঁড়িয়েছিল। গাড়ির ভেতরে বসা একজন মানুষ টানা সিগারেট টানছিলেন। তাঁর চোখ লাল, ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি। সে ফোনে বলল—“ওরা বেরিয়েছে। প্রস্তুত থাকো। দলিল এবার আমাদের হাতেই আসবে।”
অরিন্দম আর রুখসানা ট্রেনে উঠলেন। জানালার বাইরে ছুটে চলা ধানক্ষেত, নদীর ধারে ভাঙা বাঁধ, মাটির বাড়ি—সবকিছু দেখে তাঁদের মনে হচ্ছিল, যেন সময়ের স্রোত উল্টে যাচ্ছে।
মুর্শিদাবাদের পৌঁছে তাঁরা থাকলেন হাজারদুয়ারির কাছাকাছি এক পুরনো অতিথিশালায়। রাত গভীর হতে না হতেই দু’জন বুঝতে পারলেন, তাঁদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। অতিথিশালার বাইরে অচেনা দুই মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল।
পরদিন তাঁরা গেলে হজরত বাগান নামের একটি ধ্বংসপ্রায় বাগানে। গাছপালা জঙ্গল হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও ভাঙা দেয়াল। ইতিহাস বইতে লেখা আছে, এখানে একসময় আলীবর্দীর সেনাদের গোপন কুঠুরি ছিল।
হঠাৎ রুখসানা চিৎকার করে উঠল—“অরিন্দমদা, দেখুন!” একটি দেয়ালের ফাটল দিয়ে একটি মাটির কলস বেরিয়ে আছে। কলস খুলতেই একটি তামার বাক্স পাওয়া গেল। বাক্সের ভেতরে কাগজপত্র।
কিন্তু তাঁরা কিছু বোঝার আগেই তিনজন মুখোশধারী লোক এসে পড়ল। হাতে ছুরি আর বন্দুক।
“দলিলটা আমাদের দাও। নাহলে এখানেই তোমাদের রক্ত মিশে যাবে ইতিহাসের মাটিতে।”
অরিন্দম ভয়ে জমে গেলেও রুখসানা সাহস করে কাগজপত্র আঁকড়ে ধরে দাঁড়ালেন। ঠিক তখনই দূর থেকে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল। মুখোশধারীরা গালাগাল দিতে দিতে পালাল।
রুখসানা আর অরিন্দম দলিল হাতে কলকাতায় ফিরে এলেন। দলিলটি প্রাচীন ফার্সি আর বাংলার মিশ্র ভাষায় লেখা। সেখানে উল্লেখ আছে" ফিরিঙ্গীদের সঙ্গে গোপন চুক্তি ”। অর্থাৎ, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি!
তাঁরা বুঝতে পারলেন, এই দলিল ইতিহাসের অজানা এক অধ্যায় উন্মোচন করতে পারে। কিন্তু কাগজের প্রান্তে লেখা ছিল একটি সতর্কবার্তা— "যে এই লিখিত কথার গোপন উন্মোচন করবে, তার রক্তে মিশবে অভিশাপ।"
কথাটা কুসংস্কার ভেবে হেসে উড়িয়ে দিলেন তাঁরা। কিন্তু তারপর থেকেই অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল।
প্রথমে লাইব্রেরিতে আগুন লাগে, যেখানে দলিলের অনুলিপি রাখা ছিল। তারপর রুখসানার ঘরে চুরি হয়, কেবল গবেষণার নথি গায়েব। সবশেষে, অরিন্দমের কাছে অচেনা এক খাম পৌঁছায়—ভেতরে শুধু একটি রক্তমাখা ছুরি, আর লেখা- "থামো, নইলে মরবে"।
অরিন্দম বুঝতে পারলেন, এর পেছনে রয়েছে কোনো বড় শক্তি। তিনি তদন্ত শুরু করলেন। অবশেষে জানা গেল, এই সব ঘটনার পেছনে রয়েছরাজীব চৌধুরী কলকাতার এক ধনকুবের ব্যবসায়ী। রাজীব আসলে নবাবি আমলের বংশধর দাবি করেন এবং মনে করেন, সেই দলিল প্রমাণ করতে পারবে তাঁর পূর্বপুরুষের বৈধ অধিকার।
তিনি শুধু ব্যবসায়ী নন, একজন মাফিয়া। তাঁর লোকজন শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করে।
রাজীব রুখসানাকে হুমকি দিয়ে বলল—“দলিলটা আমাকে দাও, নাহলে তোমার প্রিয়জনকে খুঁজে পাবে না।”
অরিন্দম ভয় পেলেও পিছু হটলেন না। তিনি ঠিক করলেন, যেভাবেই হোক দলিলের সত্য প্রকাশ করবেন।
এক রাতে রুখসানা নিখোঁজ হয়ে গেলেন। অরিন্দম পাগলের মতো খুঁজতে লাগলেন। শেষে খবর এল, মুর্শিদাবাদের জঙ্গলে তাঁর দেহ পাওয়া গেছে।
অরিন্দম শোকে ভেঙে পড়লেন। কিন্তু পুলিশ জানাল, দেহটি আসলে রুখসানার নয়। এটি ছিল ছলনা। রুখসানাকে গোপনে বন্দি করে রেখেছে রাজীবের লোকজন।
অরিন্দম এক সাহসী পদক্ষেপ নিলেন। তিনি পুলিশকে এড়িয়ে নিজেই বেরিয়ে পড়লেন রুখসানাকে উদ্ধারের জন্য।
রাতের আঁধারে মুর্শিদাবাদের পুরনো ইমারতে ঢুকে তিনি রুখসানাকে খুঁজে পেলেন। দু’জনে মিলে পালানোর চেষ্টা করলেন। তখন রাজীব এসে দাঁড়ালেন তাঁদের সামনে। হাতে বন্দুক।
রাজীব গর্জে উঠলেন—“দলিল আমার হবে। এই দলিলই প্রমাণ করবে, বাংলার আসল নবাব আমি!”
তখনই হঠাৎ ভেঙে পড়ল ইমারতের একটি দেয়াল। ধুলোয় ঢেকে গেল চারপাশ। রাজীব বন্দুক চালালেও অরিন্দম আর রুখসানা প্রাণে বেঁচে গেলেন। কিন্তু রাজীব চাপা পড়ে গেল ধ্বংসস্তূপে।
কলকাতায় ফিরে এসে অরিন্দম ও রুখসানা দলিলটি অনুবাদ করলেন। তা ছিল - ব্রিটিশদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার দলিল। যেখানে কিছু দরবারি নিজের লাভের জন্য ইংরেজদের হাতে বাংলাকে বিক্রি করতে চেয়েছিল।
এই দলিল প্রমাণ করে, বাংলার পতনের শুরু হয়েছিল বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে।
কিন্তু তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, দলিলটি প্রকাশ করা যাবে না। কারণ এতে আজও বহু প্রভাবশালী পরিবারের নাম জড়িত। তাই তাঁরা দলিলটি আবার সংরক্ষণ করলেন কলকাতার জাদুঘরে, কঠোর নিরাপত্তার আড়ালে।
রুখসানা বললেন—“অরিন্দমদা, অভিশাপ সত্যি হোক বা না হোক, ইতিহাসকে রক্তে ভিজিয়ে দেওয়া যায় না।”
অরিন্দম চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের ছায়ারা আজও বেঁচে আছে। হয়তো ভবিষ্যতেও কেউ আবার সেই দলিলের খোঁজে নামবে।

