ঈদল ফিতর, ২০০৬ ও ২০২৬, লেখক - খগেন্দ্রনাথ অধিকারী

 


ঈদল ফিতর, ২০০৬ ও ২০২৬
খগেন্দ্রনাথ অধিকারী
_____________________
রমজানের পরে আসে প্রিয় খুশীর ঈদ। ২০০৬এর ২৯শে ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত বিশ্ব জুড়ে বেজেছে এই আনন্দের সুর। এই উৎসবকে ঘিরে শুধু মুসলিম দুনিয়াতেই নয়, সারা পৃথিবীর ধর্ম নিরপেক্ষ সকল মানুষের মহল্লায় মহল্লায় জনতা বেজেছে এই মহান আনন্দ উৎসবে। আসলে সংকীর্ণ মনা ধর্মীয় মৌলবাদীদের চোখে ঈদ, দুর্গাপূজা, বড়ো দিন, ইত্যাদি হল ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মাত্র। কিন্তু উদারমনা মানুষদের কাছে এগুলো হল মহান সামাজিক উৎসব। ২০০৬সালের  ২৯শে ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত রমজানের শেষে কাস্তের মত চাঁদের ফলা দেখে খুশির জোয়ারে উদ্বেল হয়ে উঠেছিল সসাগরা পৃথিবীর সকল মানুষ, হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান নির্বিশেষে সবাই। কিন্তু পরদিন, ৩০শে ডিসেম্বর ভোরে, দিনের আলো ফোটার আগেই, সারা বিশ্ব শোকে, ক্রোধে ও ঘৃণায়, বিহ্বল হয়ে পড়ল। প্রভাতী সূর্যেরৃ আলোর গতির চেয়ে
দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো  সেই পাশবিকতা ভরা দুঃসংবাদ। সেটি হলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, নাসেরোত্তর যুগে,অকূতোভয় যোদ্ধা, ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসির খবর।৩০ডিসেম্বর ভোরে কাকপক্ষী জাগার আগে, রমজানে উপবাসী,ইরাকী প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে  ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়েছে আমেরিকা ও তার দাসানুদাস সৌদি আরবের শেখরা। ঈদের নামাজ টুকুও তাঁকে করতে দেওয়া হয়নি। অথচ তখন সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে নিযুত মুসলিম ভাই বোনেরা রমজানের শেষে ঈদল ফিতরের নামাজ আদায়ের জন্য সৌদি আরবে উপস্থিত। ম্লান হয়ে গেল খুশীর ঈদের সকল আমেজ। ঈদগাহে ঈদগাহে, রাজপথে রাজপথে, মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে ধ্বনিত হয় একই আওয়াজ,খুনী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, সাদ্দাম খুনের অংশীদার সৌদির শেখরা হুঁশিয়ার। ঈদের আনন্দ পরিণত হয়েছে
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার ঘৃণিত দালাল সৌদি আরব বিরোধী ক্রোধে, ক্ষোভে, ঘৃণাতে, প্রতিবাদী কন্ঠধ্বনিতে।
আজ ২০২৬এর  মধ্য মার্চের শেষ লগ্নে প্রকৃতির নিয়মে আসছে আবার রমজান শেষে ঈদল ফিতর। এটা কুড়ি বছর বাদে আসছে। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু কথা মনে পড়ে যায় ---
"আছে দুঃখ আছে মৃত্যু
বিরহ দহন লাগে,
তবুও শান্তি তবু আনন্দ
তবু অনন্ত জাগে।"
কিন্তু না, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তথা ইসরায়েলের উগ্র মুসলিম বিরোধীতাবাদ, ট্রাম্প ও তার দোসরদের দানবীয়তাবাদ ও সর্বোপরি
বর্তমানের অত্যন্ত জটিল ও কূটিল বিশ্বরাজনীতির পরিস্থিতি, কবিগুরুকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্র ইসরাইলী জাতীয়তাবাদের দানবীয়তায়
জর্ডানের তীরে,গাজার প্রান্তরে,পারস্য উপসাvগরের তরঙ্গ বিধৌত ইরানের মাটিতে মানুষের শবভোজী. শকুন শিয়ালদে"র মহা উল্লাস,
তার চাপে মানুষ" মৃত্যু "ও "দুঃখ"এর কষাঘাতে জর্জরিত মানুষের মনে পবিত্র ঈদুল ফিতর সহ কোন আনন্দ অনুষ্ঠান ই আর মানুষের মনে দাগ কাটে না। কোন রকম"শান্তি, কোন রকম "আনন্দ" আর"অনন্ত"জাগে না। বরং সারা পৃথিবীর শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের চোখের তারায় এখন ঘৃণার আগুন, মুষ্টি বদ্ধ উর্ধ্বমুখী সংগ্রামী হাতে মানবতার দানকারীদের বুকের পাঁজর ভেঙ্গে চৃর্ণবিচূর্ণ করার অঙ্গিকার।কারণ,এই জল্লাদরা যে নারী শিশু আবাল বৃদ্ধ বনিতা, এমনকি বিদ্যালয় শিশুদেরকেও বাদ দেয়নি। অকালে তাদের জীবনের কুঁড়ি গুলিকে ঝরিয়ে দিয়েছে এসব নরপশুরা।
বস্তুতপক্ষে, কুড়ি বছর আগে ২০০৬সালের ঈদুল ফিতর যেমন ছিল আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার পরিবর্তে মানবতার শত্রুদের কবর দেবার জন্য শপথ গ্রহণের মুহুর্ত, ঠিক তেমনি আজ, ২০২৬সালের ঈদুল ফিতর‌ও ঠিক কুড়ি বছর পরে একই ধরনের শপথ নেবার মাহেন্দ্রক্ষণ মানবতার শত্রুদের বিরুদ্ধে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার সমস্ত তাঁবেদারদের বিরুদ্ধে। সৌদি আরবের শেখদের থেকে শুরু করে, ইসরাইল, ভারতের মাটিতে মার্কিন দাসানুদাস মোদি রাজ, কেউই এর থেকে রেহাই পাবে না। সবার বিরুদ্ধে আজ শপথের কোরাস গাইবার প্রস্তুতি। সমস্বরে আজ গাইতে হবে অটল বিশ্বাসে-----
  আমরা কোরবো জয়
আমরা কোরবো জয়
আমরা কোরবো জয় নিশ্চয়,
বুকে গভীর আছে প্রত্যয়,
আমরা কোরবো জয় নিশ্চয়।
  ইতিহাসের শিক্ষাই হলো এই যে সাম্রাজ্যবাদ যখনই কোন সংকটে পড়ে, তখন সে সেই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য যুদ্ধ বাধায়। যুদ্ধ তার আয়ু বাড়ায়, এটাই  প্রচলিত ধারণা। তবে সব সময় সেকথা ঠিক নয়। কখনো কখনো যুদ্ধ যুদ্ধ বাজদেরই কবর রচনা করে। আমরা আসছি সেই সব প্রসঙ্গে একটু পরে। আপাতত বলে রাখি যে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্বে পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটে এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়। সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থার সমাধির উপর গড়ে ওঠে CIS বা Commonwealth of Independent Stated.এতে
পশ্চিমী দুনিয়া আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলা শুরু করে যে সমাজতন্ত্রের কোন ভবিষ্যত ই নেই। তার সূর্যাস্ত হয়ে গেছে ভল্গার জলে। কিন্তু হোয়াইট হাউসের কপালে যে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল, তাকে কিছুতেই সে লোকাতে পারেনি।
বস্তুতপক্ষে, মুখে সমাজতন্ত্রবাদের বিরুদ্ধে ও ধনতন্ত্র বাদের পক্ষে তারস্বরে চীৎকার করলেও, ভিতরে ভিতরে মার্কিন অর্থনীতিn হয়ে পড়ে ক্যান্সার আক্রান্ত। জ্বালানির অভাবে মার্কিন কলকারখানা, যোগাযোগ ব্যবস্থা সব হুমড়ি খেয়ে পড়ে। উপায়ান্তর না দেখে, ইরাক প্রচুর পরিমাণে বিধ্বংসী "পরমাণু্ অস্ত্রের ভাণ্ডার মজুত রেখেছে।"এই অজুহাত খাড়া
করে, তার পদলেহী সৌদি আরবের শেখদেরকে "মীরজাফরের দামসা ফকির"হিসাবে ব্যবহার করে ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে ও২০০৬সালে ও ২০০৬ সালে  ৩০শে ডিসেম্বর ভোরে ফাঁসি দেয়।
এইভাবে আমেরিকা ইরাককে সাদ্দাম হীন করে তার তৎকালীন সংকট কিছুটা সামলে নেয়। তাছাড়া উপসাগরীয় যুদ্ধে্ সে অস্ত্র বিক্রি করেও খানিকটা অক্সিজেন পায়।
এই ভাবে তার দুর্যোগ কেটে যায়। আবার ওয়াশিংটনের সামনে দেখা দিয়েছে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সংকট। এবার ট্রাম্প জামানায়। সেবার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরাক। এবার লক্ষ্যবস্তু হোল ইরান। অজুহাত সেই একই। ইরান বিপুল পরিমাণ বিধ্বংসী পরমাণু অস্ত্রের মজুত ভাণ্ডার রয়েছে। এটা মানব জাতির পক্ষে বিপদজনক। কাজেই ইরাণকে ধ্বংস করো, তার কাণ্ডারিকে
মারো। আসলে এসব ই হোল
দানবের ছলনা। মূল কথা হলো যে মার্কিন অর্থনীতি আজ ধুঁকছে। তার পুনর্জীবনের জন্য আরব দুনিয়ার তৈল সম্পদ দরকার।তাই সেই সংকট নিরসনে ইসরাইলকে লেজে বেঁধে আমেরিকার এই গ্রাম আক্রমণ। এই আক্রমণ যে তার কাছে হবে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ওয়ার্টলু ক্ষত, বা ঔরঙ্গজেবের Deccan Ulcer, একথাটা বুঝে উঠতে পারেনি
যুদ্ধবাজ ট্রাম্প।
আসলে সেই মহাকবি বাল্মীকির বিখ্যাত উক্তি, বিনাশকালে বুদ্ধি নাশ।
  যখন কোন মানুষের বিনাশকাল উপস্থিত হয়, তখন তার বুদ্ধি নাশ হয়। রাবণের বিনাশকাল উপস্থিত হয়েছিল বলেই সে পরস্ত্রী সীতাকে হরণ করে মহারণে জড়িয়ে পড়ে সবংশে ধ্বংস হয়েছিল। কাঁদতে কাঁদতে তার স্ত্রী মন্দাদরি রাবণের চিতার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,"হায় নাথ, নিজ কর্ম ফলে, মজালে রাক্ষস কূলে, মজিলা আপনি।"
ঠিক ঐ একই কারণে কৌরবরা পাণ্ডবদেরকে বলেছিল,"বিনা যুদ্ধে নাহি দিব,সূচাগ্র মেদিনী।"তারা করে ছিল পাঞ্চালির বস্ত্র হরণ। পরিণামে সবংশে ধ্বংস হয়েছিল কৌরবরা কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে।
পবিত্র ইসলামের ইতিহাস আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয় যে  নমরুদের বুদ্ধি নাশ হয়েছিল, তাই সে নিজে খোদাই দাবি করেছিল। পরিণামে নাসিকা দিয়ে প্রবেশ করা র্মস্তিষ্কের ভিতরে মশকের কামড়ে দিশেহারা দমরুদ মশাকে মারবার জন্য নিজের হাতের মুগুর নিজের মাথায় মারতে থাকে। তাতেই
তার মৃত্যু হয়।
বিশ্ব বিজয়ের আশায় হিটলার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দাবানল জ্বেলে ছিল শান্তির সমস্ত আকূতিকে পদদলিত করে। পরিণতি হয়ে ছিল এই যে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসীবাদের
সমাধি হয়েছিল। আত্মহত্যা করে মরতে হয়েছিল হিটলার ও তার রক্ষিতা ইভা ব্রাউনকে।
ইতিহাসের এই গতিপথের মুখে এখন দাঁড়িয়ে পড়েছে ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা।ইরাণকে শেষ করতে গিয়ে সে সর্বনাশা যুদ্ধের যে আগুন জ্বেলেছে, সেই আগুনের লেলিহান শিখা তাকে ও তার সহযোগী ইসরাইল, সৌদি আরবের শেখদেরকে সহ তার প্রত্যক্ষ ও ‌পরোক্ষ সাহায্যকারীদেরকে পুড়িয়ে মারছে। হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধ জাহাজ পাঠানোর জন্য অনুরোধ করছে সে‌ তার বন্ধুদের কাছে। কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছে না। এবার ট্রাম্পকে গাইতে হবে ----
দোষ কারো নয় তো মা
আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা।
আর বহু বীরের রক্তস্রোত,
বহু মাতার অশ্রুধারাসিক্ত
২০২৬ এর মাটিতে দাঁড়িয়ে, পবিত্র রমজানের শেষে কাস্তের মত চাঁদের ফলা দেখে খুশির ঈদে মোমিন অমোমিন নির্বিশেষে সকল ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষ কোরাস গাইবে----
আমরা কোরবো জয়
আমরা কোরবো জয়
আমরা কোরবো জয় নিশ্চয়।

*লেখকের নিজস্ব মতামত*

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url