সময়কে পর্যবেক্ষণ করার অসাধারণ দক্ষতা - তৈমুর খান
সময়কে পর্যবেক্ষণ করার অসাধারণ দক্ষতা
তৈমুর খান
-----------------------------------------------------------------------
আবদুস সালামের 'অস্তিত্বের ছেঁড়া স্বরলিপি'(ফেব্রুয়ারি ২০২৬) কাব্যগ্রন্থটি সমসাময়িক কাল ও সমাজের এক নিবিড় এবং যন্ত্রণাকাতর পর্যবেক্ষণ। কবির সময়কে দেখার এই প্রয়াস তাঁর স্বতন্ত্র কাব্যনির্মাণ শৈলী ও রূপকের সার্থক প্রয়োগের মাধ্যমে পূর্ণতা পেয়েছে। গ্রন্থের নামকরণে 'অস্তিত্ব' শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে মানুষের বিপন্ন অস্তিত্বকে তুলে ধরেছেন। আধুনিক বিশ্বে মানুষ আজ শিকড়হীন, আদর্শহীন এবং দিশেহারা। কবির কবিতায় বারবার উঠে এসেছে কীভাবে মানবিকতা, দেশপ্রেম এবং মূল্যবোধ আজ সংকটের মুখে। যখন তিনি বলেন, “মানবাধিকারের কফিন ঝলসে যায় শঠতার আগুনে”, তখন বোঝা যায় যে মানুষের মৌলিক অস্তিত্বই আজ হুমকির মুখে। এই বিপন্নতাকেই কবি ‘অস্তিত্ব’ শব্দের মাধ্যমে ধারণ করেছেন। সমগ্র কাব্য জুড়েই কবির এই বোধ বিস্তৃতি পেয়েছে।
অবক্ষয় ও নৈতিক স্খলনের চিত্রায়ন:
🌿
কবি তাঁর সময়কে দেখছেন সেই চরম নৈতিক বিচ্যুতি ও অবক্ষয়ের কাল হিসেবে। তাঁর দৃষ্টিতে আধুনিক সভ্যতা এক বিধ্বংসী ঝড়ের মতো, যা মানুষের বিবেক ও চেতনাকে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। এই সময়কে তুলে ধরতে তিনি অত্যন্ত সাহসী ও রূঢ় চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন। যেমন:
"যৌনঝড়" বা "রাতের কথা দিনে বলার ক্ষমতা না থাকা"—এই ধরনের পংক্তির মাধ্যমে কবি সমাজের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ভণ্ডামি ও নৈতিক স্খলনকে ইঙ্গিত করেছেন।
কবির ভাষায়, আমরা এমন এক "অন্ধকার সময়ে" বাস করছি যেখানে সত্য প্রকাশের সাহস সমাজ হারিয়ে ফেলেছে।
মানবতার লাঞ্ছনা ও অস্তিত্বের সংকট:
🌿
সময়ের নিষ্ঠুরতা প্রকাশে কবি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক ব্যবহার করেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে বর্তমান পৃথিবী যেন এক "কসাইখানা", যেখানে আদর্শের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের বলিদান দেওয়া হচ্ছে।
কাব্যনির্মাণ শৈলীতে তাই তিনি বীভৎস রসের অবতারণা করেছেন যা সময়ের ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে: "মানবতার হাঁড়িতে সিদ্ধ হয় চেতনা / লাশের খিঁচুড়ি হয় অসন্তোষের মেলায়"।
মানবিকতার এই চরম অবমাননা এবং "বিপ্লবীদের লাশে ভনভন করছে মাছি"—এমন দৃশ্যকল্পের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতাকে তুলে ধরেছেন।
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভণ্ডামির ব্যবচ্ছেদ:
🌿
কবির সময় পর্যবেক্ষণে ধর্ম ও রাজনীতির নেতিবাচক দিকগুলো বারবার উঠে এসেছে। তাঁর নির্মাণ শৈলীতে ব্যঙ্গ ও শ্লেষের প্রকাশ দেখা যায়:
"ধর্মের হাঁড়িতে সিদ্ধ হয় মানবিকতা / ব্যর্থ দেশ প্রেম শহীদ বেদীতে বন্দী"।
তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ধর্মের নামে "মুখোশ রঙের পিরিত" শেখানো হয় এবং মানবতার কফিন শঠতার আগুনে পুড়তে থাকে।
কবি বর্তমান সময়ের ভণ্ডামি, রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং ধর্মীয় অপব্যাখ্যাকে আঘাত করেছেন। সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম বা 'সুর' কেটে গেছে। এই বিশৃঙ্খলাকেই প্রকাশ করেছেন।
আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তির টানাপোড়েন:
🌿
সময়ের সাথে সাথে মানুষের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে এবং সেই আকাঙ্ক্ষার গন্তব্য যে শূন্য, তা কবি ফুটিয়ে তুলেছেন ট্রেনের রূপকে:
"স্টপেজ হীন ট্রেনের সবাই যাত্রী আমরা / আকাঙ্ক্ষার প্লাটফর্মে উঁকি মারছে দিক শূন্য আপেক্ষিকতা"।
এখানে সময় একটি "স্টপেজ হীন ট্রেন" যা মানুষকে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
আবার 'স্বরলিপি' সাধারণত কোনো সংগীতের সুশৃঙ্খল বিন্যাসকে বোঝায়। কিন্তু কবি একে বলছেন 'ছেঁড়া'। এটি জীবনের ছন্দপতন এবং অসংলগ্নতাকে নির্দেশ করে। সমাজ ও ব্যক্তির জীবন আজ আর সুসংগত বা ছন্দময় নেই; তা আজ খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন।
বিচ্ছিন্নতা: কবি দেখিয়েছেন আদর্শিক চ্যুতি এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় কীভাবে জীবনের স্বরলিপিকে ছিঁড়ে ফেলেছে।
অপ্রাপ্তি: জীবনের না-পাওয়া, হতাশা এবং যন্ত্রণার যে খণ্ডচিত্রগুলো কবিতায় উঠে এসেছে, সেগুলো যেন এক একটি ছেঁড়া পাতার মতো। যেমন: “ব্যথার বিমর্ষ মোচড়ে নিংড়ে নিয়েছি তোমার আস্কারার দালান / পারলে খুলে দেখে নিও ছেঁড়া ডায়রির পাতা”। এই 'ছেঁড়া ডায়রির পাতা' আর 'ছেঁড়া স্বরলিপি' সমার্থক।
আবদুস সালামের কাব্যনির্মাণ শৈলীতে শব্দচয়ন এবং চিত্রকল্প অত্যন্ত ধারালো ও সরাসরি। তিনি অলঙ্করণের চেয়ে সত্য প্রকাশের রূঢ়তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর এই শৈলী সমসাময়িক সময়ের বিমর্ষ রূপ, মানবিক সংকট এবং সামাজিক পচনকে সার্থকভাবে পাঠকদের সামনে উন্মোচিত করতে সক্ষম হয়েছে। তাই বলা যায়, 'অস্তিত্বের ছেঁড়া স্বরলিপি'তে কবির সময়কে পর্যবেক্ষণ করার প্রয়াস এক গভীর পূর্ণতা লাভ করেছে। 'অস্তিত্বের ছেঁড়া স্বরলিপি'-র নামকরণটিও কবির জীবনদর্শন, সমসাময়িক সমাজবাস্তবতা এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত গভীর ও সার্থক। একটি কাব্যগ্রন্থের নামকরণ সাধারণত তার ভাববস্তু বা মূল সুরকে নির্দেশ করে। এই কাব্যগ্রন্থের ক্ষেত্রেও ‘অস্তিত্ব’ এবং ‘ছেঁড়া স্বরলিপি’—এই শব্দবন্ধদুটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি একদিকে যেমন ব্যক্তি মানুষের ভেতরের রক্তক্ষরণ ও অস্তিত্বের লড়াইকে তুলে ধরে, অন্যদিকে তেমনি সমাজের ছন্দহীন ও নীতিভ্রষ্ট অবস্থাকে নির্দেশ করে। জীবনের সুর যেখানে কেটে গেছে এবং অস্তিত্ব যেখানে বিপন্ন, সেখানে এই নামকরণ কাব্যটির আধেয় বা বিষয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে গিয়ে সার্থকতা লাভ করেছে।
#
অস্তিত্বের ছেঁড়া স্বরলিপি: আবদুস সালাম, ড্রীম রাফ্ট পাবলিকেশন, অরঙ্গাবাদ, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, পিন ৭৪২২০১, মূল্য ২০০ টাকা।
https://www.amazon.in/gp/product/8199002492/ref=cx_skuctr_share?smid=A1O554F94EOLW8
