আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস , কলমে - ডক্টর মোঃ বদরুল আলম সোহাগ

 



আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

ডক্টর মোঃ বদরুল আলম সোহাগ 


২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কেবল বাঙালি জাতির গৌরবের দিন নয়, এটি আজ সমগ্র বিশ্বের ভাষাগত অধিকার রক্ষার এক অনন্য প্রতীক। ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, সংস্কৃতির ধারক এবং ইতিহাসের বাহক। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য ১৯৫২ সালের এই দিনে বাঙালি ছাত্রসমাজ যে আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।


১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ওপর অন্যায় চাপিয়ে দেওয়া। এর প্রতিবাদে গড়ে ওঠে ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা বাংলা ভাষার দাবিতে রাজপথে নামলে পুলিশ গুলি চালায়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ বহু তরুণের আত্মদানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি অর্জনের পথ সুগম হয়। ভাষার জন্য প্রাণদানের এই ঘটনা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।


বাংলাদেশের উদ্যোগে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০০০ সাল থেকে দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের চেতনা আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করে এবং মাতৃভাষা সংরক্ষণ, বহুভাষিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে আলোচিত হয়।


বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক ভাষা শেখা প্রয়োজনীয় হলেও মাতৃভাষাকে অবহেলা করা আত্মপরিচয়কে দুর্বল করে। শিশুর বুদ্ধিবিকাশ, সৃজনশীলতা ও মূল্যবোধ গঠনে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। নতুন প্রজন্মকে তাই প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে মাতৃভাষার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ভাষাকে আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্বদরবারে তুলে ধরাই আজকের চ্যালেঞ্জ।


আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি স্বাধীন চিন্তা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ভিত্তি। ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে মাতৃভাষাকে ভালোবাসা, শুদ্ধভাবে চর্চা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মর্যাদার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়া।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url