ভ্রমণ কাহিনী- সীমান্ত ছুঁয়ে হিমালয়ের স্বপ্ন, লেখক - ড. আবু তাহির
ভ্রমণ কাহিনী
শিরোনাম : সীমান্ত ছুঁয়ে হিমালয়ের স্বপ্ন (নেপাল)
লেখক : ড. আবু তাহির
ভূমিকা:
ভ্রমণ মানে শুধু অজানার সন্ধান নয়, ভ্রমণ মানে আত্মারও এক নতুন জাগরণ। যেমন নেপালের জাতীয় কবি লক্ষ্মীপ্রসাদ দেবকোটা বলেছিলেন—
“ভ্রমণ মানুষের দৃষ্টি প্রসারিত করে, অন্তরকে মুক্ত করে।”
আমাদের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল চিকিৎসার প্রয়োজনে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়ে উঠেছিল ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রকৃতির সঙ্গে গভীর এক আলাপন। মালদা থেকে যাত্রা করে যোগবানি সীমান্ত পেরিয়ে আমরা প্রবেশ করেছিলাম সেই দেশটিতে, যার মাটি বুদ্ধের পদচিহ্নে পবিত্র, যার আকাশে হিমালয়ের শুভ্রতা, আর যার সংস্কৃতিতে শতাব্দীর ঐতিহ্য সঞ্চিত।
ভ্রমণদলে ছিলাম আমি—ড. আবু তাহির, সঙ্গে মনা, মাহিয়া ও মেলোডি। চিকিৎসা, আবিষ্কার, আর সাংস্কৃতিক কৌতূহল—এই তিনটি মূল সূত্র আমাদের যাত্রাকে বেঁধে রেখেছিল এক অভিন্ন রূপকথার মতো।
সীমান্তের পথে:
মালদা স্টেশনের চেনা ভিড়ের ভেতর থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের যাত্রা। ট্রেনের লোহার চাকা যেন এক অদৃশ্য কবিতার ছন্দে চলতে চলতে পৌঁছে দিল আমাদের উত্তরবঙ্গের শেষ প্রান্তে—যোগবানি স্টেশনে।
সেখানেই শেষ হল ভারতের ভূগোল, শুরু হল নেপালের উপাখ্যান। সীমান্ত পারাপারের সময় মনে হচ্ছিল, যেন জীবনের খাতায় নতুন এক অধ্যায় লিখছি। এপারে ভারত, ওপারে নেপাল—কেবল কয়েক কদম হাঁটলেই ভিন্ন এক দেশের মাটি, ভাষা, পোশাক, জীবনযাত্রা।
নেপালে প্রবেশের মুহূর্তে হঠাৎ মনে পড়ল নেপালের প্রখ্যাত সাহিত্যিক পরশুপ্রসাদ উপাধ্যায়ের উক্তি—
“সীমান্ত মানুষকে আলাদা করে, কিন্তু সংস্কৃতি সবসময় তাকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।”
সত্যিই, সীমান্ত পেরিয়েই টের পেলাম, মানুষ, ভাষা, খাবার কিংবা হাসি—এসবের মাঝে কত মিল! নেপালের পথঘাটে ঢুকতেই দেখা গেল রঙিন পতাকা, ছোট ছোট চা–দোকান, আর মানুষের অতিথিপরায়ণতা। যেন অচেনা নয়, পুরোনো কোনো আপন জনের দেশে প্রবেশ করেছি।
মাহিয়া ও মেলোডি উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছিল রঙিন বাজার দেখে, আর মনা ছিল সীমান্তের ইতিহাসে কৌতূহলী। আমিও মনে মনে ভাবছিলাম—এ পথ দিয়ে অতীতে কত বণিক, সাধক, ও কবি-সাহিত্যিক পাড়ি দিয়েছেন। তাদের পদচিহ্ন যেন আজও বাতাসে ভেসে আসে।
চিকিৎসার আঙ্গিনায়:
সীমান্ত পেরিয়ে যখন আমরা নেপালের অভ্যন্তরে পৌঁছালাম, তখন আমাদের ভ্রমণের প্রথম দায়িত্ব ছিল চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করা। ভ্রমণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল চোখের চিকিৎসা। তাই প্রথমেই আমরা রওনা দিলাম হিমাল আক্ষা হাসপাতালে।
হিমাল আক্ষা হাসপাতাল:
হাসপাতালের সামনের ফটকে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল “Service to Humanity is Service to God.” — সেবাই ধর্ম। ভেতরে ঢুকেই বোঝা গেল, নেপালের চিকিৎসা অবকাঠামো কতটা সুসংগঠিত। আধুনিক যন্ত্রপাতি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর রোগীদের প্রতি ডাক্তার ও নার্সদের আন্তরিক আচরণ আমাদের মুগ্ধ করল।
চোখের চিকিৎসা করাতে গিয়ে মনে পড়ল নেপালের কবি ভানুভক্ত আচার্যর সেই অমর বাণী—
“মানুষকে জ্ঞান দেয় যে দৃষ্টি, সেটিই তার মুক্তির পথ।”
চোখ কেবল আলো দেখে না, বরং সভ্যতারও প্রতিচ্ছবি ধারণ করে।
বিরাটনগর হাসপাতাল:
পরদিন আমরা গেলাম বিরাটনগর হাসপাতালে। সেখানকার পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত। ডাক্তার, নার্স, ও রোগীরা যেন সবাই এক পরিবারের মতো মিশে আছেন। এখানেই আমাদের দেখা হল খ্যাতিমান চিকিৎসক ডা. সুনীল স্যার–এর সঙ্গে।
তিনি শুধু একজন দক্ষ চক্ষু বিশেষজ্ঞই নন, ছিলেন দার্শনিক মননের অধিকারীও। এক পর্যায়ে তিনি আমাদের বললেন—
“চোখ যদি সুস্থ থাকে, তবে মানুষ শুধু বাইরের জগত দেখে না; সে তার ভেতরের জগতকেও স্পষ্টভাবে চিনতে শেখে।”
ডা. সুনীল স্যারের এই উক্তি আমাদের মনে করিয়ে দিল লক্ষ্মীপ্রসাদ দেবকোটার বাণী—
“মানুষের চোখ তার হৃদয়ের দর্পণ।”
চিকিৎসা প্রক্রিয়া শেষে আমরা সবাই বেশ স্বস্তি অনুভব করলাম। চিকিৎসা শুধু শরীরকে সুস্থ করল না, মনকেও ভরিয়ে দিল আশ্বাস ও আস্থার আলোয়।
চিকিৎসার ফাঁকে আবিষ্কার:
হাসপাতালের করিডরেই দেখা মিলল নানা মানুষের। কেউ পাহাড়ি পোশাকে, কেউ আবার শহুরে আধুনিক বেশভূষায়। তবে সকলের চোখেই ছিল আন্তরিকতা। মাহিয়া হেসে বলল—
“এরা আমাদের মতোই মানুষ, শুধু ভাষা আর পোশাক আলাদা।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, সীমান্তের ওপারে গিয়ে মানুষকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার আনন্দই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
কাঠমান্ডুর আহ্বান:
চিকিৎসা পর্ব শেষ হওয়ার পর আমাদের মন জেগে উঠল এক নতুন উত্তেজনায়—কাঠমান্ডু ভ্রমণ। নেপালের প্রাণকেন্দ্র, ইতিহাস আর সংস্কৃতির রাজধানী—কাঠমান্ডু যেন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক অনন্য তীর্থস্থান। বিরাটনগর থেকে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে যখন আমরা উপত্যকার ভেতরে প্রবেশ করলাম, মনে হল পাহাড়ের বুকে যেন এক রঙিন স্বপ্নরাজ্য জেগে আছে।
পশুপতিনাথ মন্দির:
প্রথমেই আমরা গেলাম পশুপতিনাথ মন্দিরে। বাগমতী নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দির শুধু হিন্দু ধর্মের নয়, সমগ্র নেপালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কেন্দ্র। সোনালি চূড়া, ধূপকুণ্ডের ধোঁয়া, আর ভক্তদের প্রার্থনার সুর যেন পুরো পরিবেশকে আধ্যাত্মিক করে তুলেছিল।
আমার মনে পড়ল নেপালের দার্শনিক বালকৃষ্ণ সম–এর উক্তি—
“নেপালের সংস্কৃতির প্রাণশক্তি লুকিয়ে আছে তার দেবালয়ে আর মানবমুখে।”
মেলোডি বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল মন্দিরের কারুকাজে, মাহিয়া ভক্তদের আচার-অনুষ্ঠান দেখতে মগ্ন, আর মনা ভাবছিল ইতিহাসের প্রেক্ষাপট নিয়ে। আমি শুধু অনুভব করছিলাম—একজন ভ্রমণকারী যখন অন্য সংস্কৃতির সামনে দাঁড়ায়, তখন তার মনও যেন প্রার্থনার আঙিনায় প্রবেশ করে।
বৌদ্ধনাথ স্তূপ:
এরপর পৌঁছালাম বৌদ্ধনাথ স্তূপে—বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধ স্তূপ। সাদা গম্বুজের ওপর রঙিন প্রার্থনা পতাকার দোল খাওয়া, আর স্তূপের চূড়া থেকে চার দিকে তাকিয়ে থাকা বুদ্ধের সর্বজ্ঞ দৃষ্টি আমাদের যেন অভিভূত করল।
বুদ্ধের দেশ নেপাল যেন এখানেই তার শান্তির বাণী উচ্চারণ করছে। আমার মনে পড়ল গৌতম বুদ্ধের সেই অমর উক্তি—
“মনই সবকিছু; তুমি যা ভাব, তুমি তাই হয়ে ওঠো।”
আমরা স্তূপ ঘিরে ঘড়ির কাঁটার দিকে তিনবার প্রদক্ষিণ করলাম। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মনে হচ্ছিল শান্তির দিকে এক একটি অগ্রসরতা।
পাটান দরবার স্কোয়ার:
এরপর এলাম পাটান দরবার স্কোয়ারে। এই রাজপ্রাসাদের ইট, কাঠ আর পাথরের নিপুণ কারুকাজ দেখে মনে হচ্ছিল যেন সময় থেমে গেছে। সূর্যাস্তের আলোয় প্রাচীন প্রাসাদগুলো যেন লাল সোনার আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
নেপালের জাতীয় কবি দেবকোটা এখানে এসে লিখেছিলেন—
“ইতিহাসের স্মৃতি প্রাসাদে নয়, মানুষের অন্তরে থাকে; তবে প্রাসাদ সেই স্মৃতিকে জীবন্ত করে তোলে।”
আমাদের দল একসঙ্গে বসে কিছুক্ষণ এই প্রাঙ্গণে কাটালাম। মেলোডি গাইছিল নেপালি লোকসঙ্গীতের সুর, মনা নোটবুকে আঁকছিল প্রাচীন স্থাপত্যের রেখা, আর মাহিয়া বারবার ছবি তুলছিল রঙিন আলো-ছায়ার খেলা ধরে রাখার জন্য।
হিমালয়ের ছায়ায়:
কাঠমান্ডুর ঐতিহাসিক আঙ্গিনা ঘুরে আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত অংশ এসে পড়ল—হিমালয় দর্শন। পৃথিবীর ছাদ, প্রকৃতির মহাকাব্য, মানুষের স্বপ্ন ও সাধনার প্রতীক—হিমালয় যেন ভ্রমণকারীর হৃদয়ে অনন্ত বিস্ময় জাগায়।
শুভ্র শৃঙ্গের প্রথম দর্শন:
সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। দূর আকাশে তুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গ প্রথম দর্শনে মনে হচ্ছিল—
“এ যেন সৃষ্টিকর্তার সাদা মন্দির, যার চূড়ায় লেখা আছে নীরবতার মহাগ্রন্থ।”
বিশ্ববিখ্যাত অভিযাত্রী স্যার এডমন্ড হিলারি একবার বলেছিলেন—
“হিমালয়ে ওঠা মানে পাহাড় জয় নয়, বরং নিজেকে জয় করা।”
এই কথার গভীরতা আমরা বুঝতে পারছিলাম দূর থেকে তুষারের আবরণে আচ্ছাদিত শৃঙ্গের দিকে তাকিয়ে।
প্রকৃতির মহাকাব্য:
হিমালয়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে মনে হল বাতাসও যেন অন্যরকম। ঠান্ডা হাওয়ায় তাজা তুষারের গন্ধ, আর পাখিদের ডাক মিলেমিশে এক অদ্ভুত সঙ্গীত সৃষ্টি করছিল। মাহিয়া বলল—
“এ যেন মানুষের চিত্রকলার নয়, সৃষ্টিকর্তার আঁকা এক শিল্পকর্ম।”
আমাদের মনে পড়ল নেপালের কবি দেবকোটার সেই বিখ্যাত কবিতার পংক্তি—
“আমি চেয়ে থাকি হিমালয়ের দিকে,
যেখানে আকাশ ছুঁয়ে যায় শ্বেতশিখরে।”
সূর্যাস্তের রঙে:
বিকেলের দিকে সূর্য যখন অস্ত যাচ্ছিল, তখন তুষারাবৃত শৃঙ্গগুলো লালচে-সোনালি আভায় দীপ্ত হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আকাশের আগুনে গলে যাচ্ছে বরফের হৃদয়। মেলোডি মুগ্ধ হয়ে গান গাইতে শুরু করল এক নেপালি লোকসুরে।
আমি নিজে অনুভব করছিলাম রবীন্দ্রনাথের সেই উক্তির সারবত্তা—
“হিমালয়ের স্তব্ধতা মানুষের আত্মাকে গভীরতায় নিমগ্ন করে।”
মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির বন্ধন:
হিমালয়ের গ্রামীণ অঞ্চলে আমরা দেখলাম স্থানীয় মানুষদের সরল জীবনযাত্রা। তারা কাঠের ঘরে থাকে, মাঠে কাজ করে, আর অতিথিদের হাসিমুখে আপ্যায়ন করে। পাহাড়ের কষ্টকর জীবনকে তারা গ্রহণ করেছে সহজতায়। এক বৃদ্ধ কৃষক আমাদের বললেন—
“হিমালয় আমাদের শিখিয়েছে ধৈর্য, পরিশ্রম আর সহনশীলতা।”
এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে নেপালের সভ্যতার প্রকৃত দর্শন।
খাদ্যের সুবাস:
ভ্রমণ শুধু ইতিহাস ও প্রকৃতির সঙ্গে আলাপন নয়, ভ্রমণ মানে রসনারও এক নতুন দিগন্তে পদার্পণ। নেপালের পথে পথে আমরা আবিষ্কার করেছি এক ভিন্নতর খাদ্যসংস্কৃতি, যেখানে পাহাড়ি শীতলতা আর মানুষের আন্তরিকতা মিশে তৈরি হয়েছে অনন্য স্বাদ।
মোমোর জাদু:
নেপালের রাস্তায় হাঁটলেই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে মোমো বিক্রেতাদের টঙ। ছোট ছোট পাত্রে ফুটতে থাকা গরম ভাপে তৈরি হয় সাদা, নরম, ময়দার পুঁটুলি, যার ভেতরে সবজি, মাংস কিংবা ডাল ভরা। গরম গরম মোমো মুখে দিলেই মনে হয়—
“পাহাড়ি কুয়াশা যেন রসনার ভিতর গলে যাচ্ছে।”
নেপালের খাদ্য সমালোচক কৃষ্ণপ্রসাদ উপাধ্যায় একবার লিখেছিলেন—
“মোমো আমাদের আতিথেয়তার প্রতীক; এটি দিয়ে আমরা ভ্রমণকারীকে স্বাগত জানাই।”
আমরা যখন একসঙ্গে বসে রাস্তার ধারে মোমো খেলাম, তখন মেলোডির উচ্ছ্বাস, মাহিয়ার আনন্দ আর মনার কৌতূহলী প্রশ্ন মিলেমিশে মুহূর্তটিকে অবিস্মরণীয় করে তুলল।
থুকপার উষ্ণতা:
এক শীতল সন্ধ্যায় আমরা খেলাম থুকপা—তিব্বতি প্রভাবিত নেপালি স্যুপ। নুডলস, সবজি, মাংস আর মশলার গন্ধে ভরে উঠেছিল পুরো পাত্র। চুমুক দিতেই মনে হচ্ছিল পাহাড়ি শীত গলে যাচ্ছে শরীরের ভেতরে।
কবি দেবকোটা বলেছিলেন—
“উষ্ণতা শুধু হৃদয়ে নয়, খাদ্যেও থাকে।”
থুকপা যেন সেই উষ্ণতারই প্রতীক।
ছ্যাং-এর গল্প:
এক বিকেলে স্থানীয় মানুষ আমাদের খাওয়ালেন ছ্যাং—ধান ও বার্লি থেকে তৈরি এক বিশেষ পানীয়। এটি ছিল তাদের সামাজিক বন্ধনের অংশ। পাহাড়ি মানুষজন উৎসবে, অতিথি আপ্যায়নে ছ্যাং পরিবেশন করেন। স্বাদে এটি টক-মিষ্টি, তবে আন্তরিকতায় ছিল ভরপুর।
এক বৃদ্ধা হাসিমুখে বললেন—
“ছ্যাং শুধু পানীয় নয়, এটি আমাদের মিলনের সেতুবন্ধ।”
বাজারের দৃশ্য:
কাঠমান্ডুর বাজারে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল শুকনো ইয়াক মাংস, পাহাড়ি মসলা, আর নানা ধরনের শাকসবজি। বাজারের ভিড়ে মানুষের ডাকাডাকি, দরদাম, আর সুগন্ধি মশলার ঘ্রাণ মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা।
সভ্যতা ও সংস্কৃতি:
চোখের চিকিৎসা, কাঠমান্ডুর ঐতিহাসিক ভ্রমণ, হিমালয়ের সৌন্দর্য আর খাদ্যের আস্বাদনের পর আমাদের যাত্রার সবচেয়ে গভীর উপলব্ধি এল—নেপালের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে।
আতিথেয়তা ও মানুষের স্বভাব:
নেপালের মানুষ আশ্চর্যরকম অতিথিপরায়ণ। গ্রামে কিংবা শহরে—যেখানেই যাই না কেন, মানুষের মুখে এক চিরচেনা হাসি। তাদের স্বভাবের সহজাত আন্তরিকতা দেখে মনে হয়, এরা জীবনকে কম সম্পদে হলেও ভরিয়ে রেখেছে সমৃদ্ধ মানবিকতায়।
একজন বৃদ্ধ কৃষক বলেছিলেন—
“আমাদের সম্পদ হিমালয়, আমাদের শক্তি পরিশ্রম, আর আমাদের অহংকার অতিথি আপ্যায়ন।”
শিল্প ও স্থাপত্য:
নেপালের সভ্যতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় তাদের শিল্প ও স্থাপত্যে। কাঠমান্ডু উপত্যকার প্রাচীন প্রাসাদ, মন্দিরের কারুকাজ, আর বৌদ্ধ স্তূপের নকশা প্রমাণ করে যে এ দেশ বহু শতাব্দী ধরে সংস্কৃতির মিলনস্থল।
নেপালি সাহিত্যিক বালকৃষ্ণ সম বলেছিলেন—
“আমাদের শিল্প শুধু পাথর আর কাঠে খোদাই নয়, এটি আমাদের আত্মার রূপ।”
সঙ্গীত ও নৃত্য:
গ্রামের আঙিনায় কিংবা উৎসবের দিনে নেপালি লোকসংগীত আর নৃত্য শোনা যায় সর্বত্র। মেলোডি এক সন্ধ্যায় যোগ দিল স্থানীয় তরুণীদের গানের আসরে। বাঁশির সুর, মাদলের তাল, আর গানের কণ্ঠে যে আনন্দ ছিল, তা কোনো বই বা ইতিহাসে লেখা যায় না।
সাহিত্য ও দর্শন:
নেপালের কবি ও সাহিত্যিকরা দেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।
ভানুভক্ত আচার্য নেপালি ভাষায় রামায়ণ রচনা করে সাধারণ মানুষকে মাতৃভাষার শক্তি চিনিয়েছিলেন।
লক্ষ্মীপ্রসাদ দেবকোটা, যিনি জাতীয় কবি, লিখেছিলেন—
“কবি হলেন সেই চোখ, যিনি সমাজকে দেখতে শেখান।”
আধুনিক লেখক পার্থিব সুব্বা বলেছিলেন—
“সংস্কৃতি হলো এমন এক নদী, যা কখনও শুকিয়ে যায় না।”
ধর্মীয় সম্প্রীতি:
নেপালে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পাশাপাশি বাস করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। মন্দিরের পাশে স্তূপ, প্রার্থনা মন্দিরের পাশে ঘণ্টাধ্বনি—সবই প্রমাণ করে নেপাল হল বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক জীবন্ত চিত্রপট।
প্রত্যাবর্তন:
পাঁচ দিনের ভ্রমণ শেষে যখন ফেরার দিন উপস্থিত হল, আমাদের মনে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল। আনন্দ, প্রশান্তি আর খানিকটা বিষাদ।
যাত্রার শেষ সকাল:
সেদিন ভোরবেলায় কাঠমান্ডুর আকাশে হালকা কুয়াশা ছিল। হিমালয়ের শীর্ষে সূর্যের সোনালি আভা পড়েছিল, যেন বিদায় বাণী জানাচ্ছে। আমরা সকলে—আমি, মনা, মাহিয়া ও মেলোডি—ট্রাভেল ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিলাম।
মাহিয়া বলল,
“এতদিনে মনে হচ্ছে যেন এই দেশও আমাদের নিজের হয়ে গেছে।”
আমি উত্তর দিলাম,
“হৃদয় যেখানে বন্ধুত্ব পায়, সেখানেই তো মানুষ নিজের দেশ খুঁজে নেয়।”
সীমান্তের পথে:
বিরাটনগর থেকে গাড়ি ধরে আমরা পৌঁছালাম যোগবানি সীমান্তে। সেই একই রেললাইন, সেই একই প্ল্যাটফর্ম—কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তখন একেবারেই বদলে গেছে। নেপাল যেন আমাদের হৃদয়ের এক অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
রেলযাত্রার স্মৃতি:
কলকাতা যোগবানি ট্রেনে ফেরার সময় জানালার পাশে বসে আমি চোখ বন্ধ করে স্মৃতিগুলো গুনছিলাম।
হিমাল আক্ষা হাসপাতালের চিকিৎসা
ডা. সুনীল স্যারের উপদেশ
কাঠমান্ডুর প্রাসাদ ও স্তূপ
স্থানীয় খাদ্যের স্বাদ
মানুষের হাসিমুখ আর সংস্কৃতির আবহ
সব মিলিয়ে ভ্রমণ যেন এক স্বপ্নের মতো।
কবির কণ্ঠে বিদায়:
আমার মনে পড়ল লক্ষ্মীপ্রসাদ দেবকোটার কবিতার সেই পংক্তি—
“যে মানুষ ভ্রমণ করে, সে বারবার জন্ম নেয়; প্রত্যেক ভ্রমণ শেষে তার ভেতরে তৈরি হয় নতুন মানুষ।”
আমাদের প্রত্যাবর্তনও ছিল তেমনই এক নতুন জন্ম। আমরা চারজনই যেন নতুন চোখে পৃথিবীকে দেখার শক্তি পেলাম।
ঘরে ফেরা:
অবশেষে মালদা পৌঁছে যখন বাড়ির দরজায় দাঁড়ালাম, মনে হল আমরা শুধু ঘরে ফিরিনি—বরং সমৃদ্ধ হয়েছি এক অমূল্য অভিজ্ঞতায়। ভ্রমণ আমাদের শিখিয়েছে—
সীমান্ত মানুষকে আলাদা করে না, বরং নতুন করে পরিচয় করায়।
সভ্যতা ও সংস্কৃতি আসলে সকল মানুষের সম্মিলিত উত্তরাধিকার।
চিকিৎসা কেবল শরীরকে নয়, আত্মাকেও সুস্থ করে।
এভাবেই শেষ হল আমাদের নেপাল ভ্রমণ কাহিনী—একটি যাত্রা, যা শুধু ভৌগোলিক সীমান্ত পেরোয়নি, বরং মানবিকতার সীমান্ত ছুঁয়ে গিয়েছে।






