প্রবন্ধ - কবি মোঃ ইজাজ আহামেদ-এর কবিতায় সমসাময়িকতা, অনুষঙ্গ ও জীবন; লেখক - ড. মনোরঞ্জন দাস (অ্যাডভকেইট - কলকাতা হাইকোর্ট)

 


প্রবন্ধ - কবি মোঃ  ইজাজ আহামেদ-এর কবিতায় সমসাময়িকতা, অনুষঙ্গ ও জীবন


ড. মনোরঞ্জন দাস

(অ্যাডভকেইট্-কলকাতা হাইকোর্ট, কবি, লেখক, গবেষক)


          পারম্পর্য ও সমান্তরাল সাজুয্যে কবি মো. ইজাজ আহামেদ নির্মল এক অধ্যায় যেখানে সৃষ্টির স্থাপণ ও প্রস্থাপণ পার্বিক আবর্তনে থাকে। তিনি তার নান্দনিক নন্দননামায় প্রশিক্ষিত উচ্চারণে ও উদ্ভাবনে একক হন যেখানে সমসাময়িকতা, অনুষঙ্গ এবং জীবন ধারণবাহী। তিনি পৌনোপৌনিক তার কবিতায়। তিনি তার সৃষ্টির সৌন্দর্যে নৈতিক নির্মান করেন, করেন পরিবর্তন যেখানে তার নিজস্ব ব্যাপণ আছে, আছে ধাবমান আলোকপাতের অধ্যায়ে অথবা অন্ধকারের অন্যায়গাথা । তিনি লেখেন,
      ' ... প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানবতা ও শান্তির বার্তা, নৈতিকতা, মানবসভ্যতার বিনাশকারী বিশ্বে ঘটমান যুদ্ধ,শরণার্থীদের করুণ জীবন আলেখ্য , সমাজের বাস্তবচিত্র, করোনার আবির্ভাবে পৃথিবীব্যাপী পরিবর্তন  ও করোনার দাপটে
মানুষের গৃহবন্ধী-অসহায়তার কথা অতি দক্ষতার সঙ্গে নিপুণভাবে আলোকপাত করা হয়েছে...। পড়ন্ত সন্ধ্যার মতো বিশ্বটা অর্থাৎ মানব সমাজ আবছা আলোর দিকে, অন্ধকারময়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে- সেই চিত্র ...অনেক কবিতায় ফুটে উঠেছে।
        'দু:খ, আনন্দ এবং সমাজ তথা বিশ্বে চলতে থাকা দু:খ-দর্দশা, হিংসা, অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা, ভেদাভেদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, অন্যায় ইত্যাদি মানসিক ও সামাজিক ব্যাধিগুলি জহুরীর চোখে দেখে এবং সেগুলি থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়ে বিশ্বসৌভাতৃত্ব ও মানবতার জয়গান করা হয়েছে...'১

       কবি মোঃ ইজাজ আহামেদ বোঝেন, সমসাময়িকতা হলো বর্তমান সময়ের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয়, অনুষঙ্গ হলো কোনো কিছুর সাথে যুক্ত বা সম্পর্কিত অন্য কিছু, এবং জীবন হলো মানব অস্তিত্ব ও তার সকল অভিজ্ঞতা। এই শব্দগুলো একসাথে ব্যবহার করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, বর্তমান সময়ের সাথে সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং মানব জীবনের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা ও তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো।
           তিনি অনন্যতার সাজুয্যে কোকিলের ডাক ও  প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সংস্পর্শে আনেন । তিনি লেখেন,
'বসন্তের এক অপরাহ্নে
বাড়ির ছাদে বসে
লিখছিলাম কবিতা;
হঠাৎ কানে ভেসে এলো কোকিলের কুহু কুহু ডাক;
কোকিলের ডাক শুনে মনে পড়লো তোমার কথা;
তুমি শুনিয়েছিলে মিষ্টি গান;
কি সুন্দরই না ছিল তোমার গলা;
মনেহয় তোমার চেয়ে বসন্তের কোনো কোকিলও
এত সুন্দর সুরালো গান গায় নি কখনও।'২
          কবিতার আবেগময় স্নিগ্ধধারায় সিক্ত হয়ে এবং অদ্ভূদায়ণময় প্রত্যয়ে ঋদ্ধ ও পৌনোপৌনিক হয়ে তিনি আবারও লেখেন,
'বাতাসে ভেসে আসছিল ফুলের সুগন্ধ;
কিন্তু তোমার শরীরের সুগন্ধ বসন্তের চেয়েও মধুর ছিল।
এই যে বসন্তে গাছে গাছে পুষ্প,
নির্মল আকাশে আনন্দে আকাশে পাখিরা ডানা মেলে করে নৃত্য;
প্রকৃতি যেন উৎসবে মেতে ওঠে নতুন সাজে;
কিন্তু তুমি যখন সাজতে
সবুজ,লাল, গোলাপি শাড়িতে,
কপালে নীল টিপ পরে,
দিতে চুলে পুষ্প,
মনেহয় বসন্তের সৌন্দর্য ও তোমার কাছে ম্লান হয়ে যেত।'৩
           কবি তার সমূহ উপস্থাপণার সম্পৃক্তায়ণে অনুভব করেন যে সময়ের সাথে যুক্ত অবস্থানই প্রামান্যে এবং প্রাধাণ্যে থাকে কবিতাধ্যায়ে, এবং সামাজিকতা, দার্শনিকতা সমান্তরাল সম্পর্কে
সমসাময়িকতার তীর্থে পর্যাবরণে যায়। তিনি বস্তুত  ভাবের সম্পর্ক থেকে যুক্তায়ণে যান এবং উপাদানবাহী হন। একটি কবিতা,

' উদ্বেলে তোমার অধ্যায় একক অবস্থানে
প্রপালনে আছে
যেখানে তোমার ভাব ও শব্দের অনুশীলনে
অনুক্র মণ হয় কবিতা রথে।

ইজাজ, তোমার বোধে বোধে
প্রিয়ময়তা
প্রাপ্ত প্রত্যয়ে থাকে প্রাণবন্ত
এখানেই তোমার নিশ্চয়তা
          যোগেযোগে হয় অংশী
এইই তোমার  উপস্থাপণ কবিতায়... ।'৪
           কবি জানেন,জীবনের অনুষঙ্গ বলতে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক পরিমণ্ডল, পারিবারিক বিষয়গুলো এবং সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে বৃত্তবাহী করা। তিনি এও জানেন, মানব অস্তিত্ব, তার সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম, অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সকল দিক জীবন জোয়ার ও কবিতাংশে অংগবাহী। কবি তার সৃষ্টিশীলতায় কাল এবং কালাংশকে অবগুন্ঠনে আনেন আবার সোনালী রোদ্দুর সংস্থাপণে যান। তিনি
লেখেন,
' শীতকালের দিনটি ভোরে ধূসর পোশাক পরে এসেছে,
রূপালি কুয়াশার অবগুন্ঠনে
মুখ ঢেকেছে সূর্য,
ভোর বিদায় নিতেই সোনালী রোদ্দুরের গহনা ও
পোশাক পরে আবির্ভূত হয়েছে সে, উত্তরে বাতাস গান গাইছে।'৫
           কবি মো. ইজাজ ইজাজ আহামেদ প্রীতিসিক্ত হন এই ভেবে,ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের বিভিন্ন দিক, মানসিকতা, আবেগ, বিশ্বাস, সম্পর্ক, এবং সমাজের সাথে ব্যক্তির মিথস্ক্রিয়া নিয়ে জীবনাংশে মেশে। তিনি আত্ম প্রাঙ্গনের অভিভূত অধ্যায়ে আনুসঙ্গিক  উৎকর্ষে এবং প্রকর্ষে সংযোগবাহী হয়ে ধরণ ও
ধারণনামায় পারিবারিক হন, হন অবস্থানে অক্সিজেন অধ্যায়। তিনি লেখেন,
' গাছ তার পরিবারের অনেক সদস্যকে হারিয়েছে
হারিয়েছে অক্সিজেন তার স্বাস্থ্য
বায়ু তার পরিবারের সদস্যের
এরকম অবস্থা দেখে
পাচ্ছে  বড় কষ্ট
প্রাণীরা বাসস্থান হারিয়েছে
হারিয়েছে মনোরম আবহাওয়া
এইদিকে মনুষ্যলয়ে হানা দিয়েছে করোনা
কৃত্রিম অক্সিজেনও নেই
অনেকের আত্মা এসে দাঁড়িয়েছে কন্ঠে
আর মৃতরা খড়কুটোর মতো
তাকিয়ে আছে
আকাশের দিকে'৬

         কবি তার নিজস্ব  ঊজ্জ্বল  সমৃদ্ধিতে শব্দ ও ভাবে র প্রকরণগত  অবস্থানে থেকে জোছনাসাগরের  অধিবাসী হন । তিনি লেখেন,

'সমুদ্রের বুদবুদের মতো মৃত্যুর সাগরে
ম্লান হয়ে যাচ্ছে অনেক প্রাণ
পৃথিবী বড় কষ্ট পাচ্ছে দেখে
চাঁদ তার চোখের জলের জোছনায় ভাসিয়ে দিচ্ছে
আর মাঝে মাঝে কান্না থামিয়ে চলে যাচ্ছে
বিরহে লক ডাউনে
সাগরের তটে লেখা অনেকের নাম ঢেউয়ে যাচ্ছে মুছে
পৃথিবীর পাতা থেকে
আকাশ মুহুমুর্মুহু চোখের জল ফেলছে কেঁদে
নীল শাড়ির অধিবাসীদের দেখে।'৭
       কবি মোঃ ইজাজ আহামেদ দীপ্ত মানবতার অঙ্গনে চিন্তনকে উদারবাহী করে আববেগময়তাকে সুদুরপ্রসারী করে অন্তরের অংশে পুষ্ট করেন, করেন উদারতম সংস্থাপণ। তিনি আবার ভাবের আবর্তন-বিবর্তন প্রসারে অনুরনিত হন সতত। একটি ছড়া,

'তুমি দীপ্ত, তুমি সিদ্ধ
তুমি হে ইজাজ
তোমার কর্মমাঝেই
চেনে যে সমাজ।।

তোমার কবিতা জানি
বড় মধুময়
তোমার কবিতা পড়ে
সেটা জানা যায়।।

দেশে আর বিদেশে
তোমারই নাম
একাকারে ভরে হয়
এক প্রিয়ধাম।।

তোমার কবিতা মাঝে
তুমি রবে বেঁচে
এছাড়া অধিক আর
বলার কি আছে!!'৮
        সর্বোপরি কবি মোঃ ইজাজ আহামেদের কবিতা প্রাণ-প্রত্যয়ের অবস্থানে ও অবগাহনে পূর্ণতা পায় যেখানে সমসাময়িকতা, অনুষঙ্গ এবং জীবনবোধ সুদুরপ্রসারী এক এবং একক অধ্যায় হয়ে রয়।
...............
তথ্যসূত্র
১. মোঃ ইজাজ আহামেদ; পড়ন্ত সন্ধ্যা, নোশন প্রেস, ২০২৩; পৃ-৫;
২. ঐ; পৃ-৩২;
৩. ঐ;
৪. লেখক- তাৎক্ষণিক কবিতা;
৫. ১-নং-এর মতো; পৃ-৫০;
৬. ঐ; পৃ- ৫৩;
৭. ঐ;
৮.  লেখক- তাৎক্ষণিক ছড়া;




Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url